রূপকথার রাজকুমারী

একদিন রাজকুমারীর ইচ্ছে হল পাহাড়ি নদীতে স্নান করতে যাবেন। সম্যুক্ত রাজার রাজত্বের উত্তরেই হিমালয়। সেখান থেকে অনেক পাহাড়ি নদী নেমে এসেছে সমতলে। রাজধানী সম্যুক্তপুর। সেখান থেকে তিনদিন তিনরাত পথ পেরোলে পাহাড়ের পায়ের তলায় পৌঁছনো যায়। সে ভারি মনোরম জায়গা। বনের শুরু। গাছপালার মধ্যে দিয়ে জঙ্গলের পথ বেয়ে পাহাড়ের ওপরের দিকে চলতে চলতে সাত ক্রোশ পথ পেরোলে তবে সরযূ নদী। সে অবধি তার সাম্রাজ্য।

ছোটোবেলা থেকেই রাজকুমারী নন্দিনীর দেখভাল করেন রাজা নিজে। মা মরা মেয়ে। কিন্তু এখন তার নিজেরও বয়েস হয়েছে। তা হোক, স্নেহের অভাব কখনওই ঘটেনি। রাজকুমারী তরুণী থেকে যুবতী হয়েছেন সদ্য। তবুও রাজা ছেলেবেলার মতোই দেখভাল করেন তাকে। নিয়মিত। তিনি চান মেয়ে সবদিক থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক। সবরকম স্বাধীনতাই তিনি মেয়েকে দিতে প্রস্তুত। মেয়ে নাইতে যাবে শুনে একটু উৎকন্ঠা হল বইকি! পাশাপাশি খুব খুশিও হলেন। তিনি তো চান যে তার মেয়ে রাজত্বের সব জায়গার সাথেও পরিচিত হয়ে উঠুক।

রাজামশাই খবর দিলেন, রাজপ্রাসাদ থেকে লোক-লশকর, পাইক-পেয়াদা, সাজসরঞ্জাম, প্রসাধন কোনও কিছুর অভাব যেন না ঘটে। রাজকুমারীর যাতে কোনও অসুবিধে না হয়। অন্দরমহলে সাড়া পড়ে গেল। বাহির-মহলে সাড়া পড়ে গেল। পরদিন ভোরে যাত্রা শুরু। সব ঠিকঠাক হয়ে রইল। রাজকুমারী মনে মনে পাহাড়ি নদীর স্রোতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে জানালার পাশেই আরামকেদারার ওপরেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যেই কত না প্রজাপতি উড়ল, কত রঙিন মাছ এসে আঁচলের পাশে খেলা করে গেল, হরিণ এসে কথা কয়ে গেল তার ইয়ত্তা নেই।

তো, রওনা হওয়া গেল। দশজন দেহরক্ষীর দল ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ঘিরে রইল রাজকুমারীকে। কোমরে তলোয়ার। হাতে তীক্ষ্ণ ফলার বর্শা। রাজকুমারীর ঘোড়াটিও দেখবার মতো। গাঢ় বাদামী তার রঙ। কপালের ওপর থেকে নাকের কাছাকাছি অবধি সাদা লোমের চওড়া দাগ, যেন শ্বেতশুভ্র তিলক। ঘাড়ে কেশরের ঝালর। তার ওপরে রাজকুমারী বসে। গায়ে নীল রঙের পোষাক। মিহি মসৃণ নরম নীল কাপড়ের ওড়নার প্রান্ত উড়ছে হাওয়ায়।

রূপকথায় যেমন হয়, রাজকুমারীর দুধে আলতা রঙ, গাঢ় মেঘের মতো চুল, কাটা হিরের দ্যুতির মতো হাত-পায়ের আঙুল, সারা পৃথিবীতে তার তুল্য সুন্দরী যেন আর নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। এই রাজকুমারী কিন্তু তেমনটি নন। তার গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই মুখশ্রী। কিন্তু যে বৈশিষ্ট্য তাকে আলাদা করেছে তা তার চোখ আর তার চোখের দৃষ্টি এবং তার হাতের মুদ্রা, তার ঘুরে তাকানোর ভঙ্গী। তেমনটা সত্যিই সারা পৃথিবী খুঁজে ফেললেও দুটি পাওয়া মুশকিল। এত মায়া আর নরম চোখের দৃষ্টি কেউ দেখেনি। আবার প্রয়োজনে সে চোখেই আগুনের দৃষ্টি দেখেছে রাজপ্রাসাদের কর্মচারীরা, সৈন্যসামন্ত, পাত্র-মিত্র-অমাত্য সকলেই। অন্যায়ের বিপক্ষে অমন রোষদৃষ্টি, যে না দেখেছে সে বিশ্বাসই করবে না। অত স্নিগ্ধ চোখে যে এমন আগুন ঠিকরোতে পারে! ছেলেবেলা থেকেই অন্যায়ের সাথে আপোসহীন। আর এই রূপ-গুণের খ্যাতিই দূর দূর রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনদিন পথ চলে, পাহাড় চড়ে, পথমধ্যে তিনরাত বিশ্রাম নিয়ে রাজকুমারী তার বাহিনীসমেত পৌঁছোলেন এসে সরযূর পাড়ে। নদী দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন রাজকুমারী। এতকাল নদী দেখেছেন সমতলে, তার বিস্তার রয়েছে, স্রোতও রয়েছে কিন্তু পাহাড়ি নদীর অন্য রূপ। তার উচ্ছ্বলতা মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে উঠছে জল, যেন নদীটির হাসি। এঁকেবেঁকে কী তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে! ঘোড়া থেকে নেমে সেদিকে ঠায় তাকিয়ে রইলেন রাজকুমারী। তার দৃষ্টি আরও নরম হয়ে এল। মুগ্ধ-বিস্ময় যেন আর কাটে না। নদীর বেশ খানিকটা উঁচুতে সমতল জায়গা দেখে ততক্ষণে পাইক-বরকন্দাজেরা তাঁবু ফেলতে শুরু করে দিয়েছে।

বেলা পড়ে এসেছে। নদীর পাড়ে পাড়ে হেঁটে গেলেন রাজকুমারী। সঙ্গে প্রিয়সখী অপালা। দু’জন রক্ষী দাঁড়িয়ে রইল দূরে। হুকুম হল আর কেউ যেন না আসে। নদীতীর ধরে একটা নির্জন জায়গায় এসে থামলেন দু’জনে। সেখানে জঙ্গল ঘন। নদীর বুকে ছোটোবড়ো প্রকান্ড নানা আকারের পাথর। তার মাঝ দিয়ে ছুটে চলেছে নদী। প্রচন্ড তার বেগ। মুগ্ধতা আর কাটে না রাজকুমারীর। নদী বেশ চওড়া এখানে। একটা পাথরের ওপর বসে পড়লেন তিনি। গালে হাত দিয়ে চেয়ে রইলেন নদীর দিকে। পা ঝুলিয়ে দিলেন নিচে। নদীর জল ছুঁয়ে রইল তার পায়ের পাতা। পায়ের নূপুর। ওপারে অন্য দেশ। সেখানকার খবর ভালোভাবে জানা নেই। শুনেছে, সেখানে কোনও রাজা নেই। তবে সকলেই সেখানে বেশ সুখী আর স্বাধীন। দেশের সবাই মিলে একদল মানুষকে নির্বাচন করে, তারাই দেশটা চালায়। যে কেউ দেশ চালাতে পারে, যোগ্যতা থাকলেই, যেন সবাই রাজা। রাজকুমারীও বিলক্ষণ শুনেছেন তার কথা। ওদেশে নাকি কবিরা আপন খেয়ালখুশির কাব্য রচনা করতে পারে, রাজানুগ্রহে শুধু রাজবন্দনার দরকার নেই তাদের। ভারি আশ্চর্যের কথা। ওপারের দিকে তাকিয়ে একথাই ভাবছিলেন রাজকুমারী।

এদিকে সখী অপালা তো চিন্তায় পড়ে গেছে। এই খরস্রোতা নদীতে রাজকুমারী নামবেন কী করে? ভেসে যাবেন যে! কাউকে যে ডেকে নেবেন সে উপায়ও নেই, রাজকুমারীর হুকুম। তিনি একলাই স্নান করবেন নদীর জলে। কিন্তু তিনি তো সাঁতার জানেন না। সাত-পাঁচ চিন্তায় জর্জর হয়ে অপালা দাঁড়িয়েই রইলে। অনেক বাদে যখন সন্ধে হয় হয়, রাজকুমারী পা তুলে নিয়ে বললেন, “কাল ভোরে আমি নাইতে আসব। বুঝলি! এখন চল।”

অপালা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কাল ভেবে-টেবে যা হোক একটা উপায় বার করতে হবে। তারপর দু’জন ফিরে চলল তাঁবুর দিকে। সারারাত নদীর আওয়াজ কানে এল। ঝমঝম-ঝরঝর-খলখল-ছলছল। সাদা জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতে থাকল নদীর বুক।

তারপর ভোর হল। পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল রাজকুমারীর। কানে এল নদীর জলের শব্দ। অপালাকে ডেকে নিলেন। কিছু পরে ভালো করে আলো ফুটে উঠলে অপালাকে নিয়ে সেইখানে চললেন, গতদিন যেখানে গিয়ে বসেছিলেন। পায়ে পায়ে ছায়াঢাকা নদীটির তীরে এসে পাথরের ওপর বসে পড়লেন রাজকুমারী। অপালা, রাজকুমারীর গায়ে চন্দনের প্রলেপ দিয়ে দিলে। রেশমের কাপড় ভিজিয়ে ঘষে দিলে পা। তারপর রাজকুমারী পা রাখলেন জলে। ও মা, দু’পা এগোতেই বিপত্তি! স্রোতের টানে ভেসেই যাচ্ছিলেন। ভাগ্যিস, অপালাও পেছন পেছন খানিক নেমে এসেছিল! কোনওমতে পোশাকের কোনা ধরে টেনে নিয়ে এল রাজকুমারীকে। পাড়ে এসে বসে ধাতস্থ হবার পর মনখারাপ হয়ে গেল রাজকুমারীর। কীভাবে সম্ভব তাহলে! চুপ করে বসে রইল দু’জনে। অপালা জিজ্ঞাসা করল, “কোনও রক্ষীকে ডাকব, রাজকুমারী?”

“না না। আমরাই উপায় করব যা হোক।”

বেশ খানিকক্ষণ সময় কেটে যাবার পর রাজকুমারী বললেন, “আমার ওড়না ধর, অপালা। একে দড়ির মতো ব্যবহার করে নদীর জলে নেমে স্নান করব।”

তাই হল। অপালা ধরে রইল ওড়না। রাজকুমারী জলে নামলেন। চার পা যেতে না যেতেই ওড়না গেল হাত ছেড়ে, ভেসে চলল নদীর জলে। ভয় পেয়ে দু’জনে দু’জনকে ধরলে জড়িয়ে। শেষে আবার কোনওমতে দু’জনেই উঠে এল পাড়ে। ওদিকে ওড়না চলল ভেসে। চোখের আড়াল হয়ে গেল। রাজকুমারী হতাশ হয়ে চেয়ে রইলেন।

এদিকে হয়েছে কী, ওপারের এক বাউন্ডুলে পথিক নদীর জলে নেমে মহানন্দে সাঁতার দিচ্ছিল। যেন একটা চমৎকার মাছ। হঠাৎ তার মুখে মাথায় জড়িয়ে গেল একটা নীল রঙের ওড়না। ভারি অবাক হয়ে গেল সে। সাঁতরে নদীর এদিকের পাড়ে উঠে এল সে। এদিক ওদিক চাইল। তারপর মুখ-মাথা পরনের কাপড় দিয়ে মুছে নিয়ে ওড়না কাঁধে ফেলে চলল নদীর উজানে যেদিকে রাজকুমারীরা ছিলেন। বেশ খানিকটা আসতেই রাজকুমারী নন্দিনী আর অপালাকে দেখতে পেল মানুষটা। সে তো আর রাজকুমারীকে চেনেও না জানেও না, সে ভাবল তারা নেহাত গ্রামেরই মেয়ে। ফলে সেও চেঁচিয়ে বলে উঠল, “এই যে ও মেয়ে, তোমাদের কার ওড়না ভেসে গিয়েছিল জলে?”

অপালা তাড়াতাড়ি এগিয়ে ওর হাত থেকে ওড়না নিয়ে রাজকুমারীর গায়ে জড়িয়ে দিল।

“তোমরা বুঝি নদীতে স্নান করতে এসেছিলে?”

অপালা উত্তর না করে ঘাড় নাড়ল। তাই দেখে হেসে উঠল লোকটি। “তাই বুঝি? এস আমার সাথে।” এই বলে যেদিক দিয়ে এসেছিল সেদিকেই চলতে শুরু করল। রাজকুমারীর দিকে চাইল অপালা। দেখল, রাজকুমারীর সম্মতি রয়েছে। লোকটিকেও তার বেশ ভালো মানুষ গোছের মনে হল। অবিশ্যি তেমন হলে হাঁক দিয়ে রক্ষী ডাকলেই হল। সে আর দেরি না করে পায়ে পায়ে লোকটিকে অনুসরণ করল। সঙ্গে রাজকুমারী।

ছায়াছায়া একটা চওড়া বালিঢাকা জায়গা। নদীর পাড়ে চ্যাটালো পাথর। নদী এখানে এসে লাফিয়ে খানিকটা নীচে নেমে গেছে। জল যেখানে পড়ছে সেখানটাতে একটা দারুণ ঘূর্ণি তৈরি হয়েই শান্ত হয়ে রয়েছে নদীর জল। যেন একটা পুকুর। কিছুদূর গিয়ে পাথরের ফাঁক দিয়ে তারপর আবার নিচের দিকে তীব্র বেগে বয়ে চলেছে স্রোত। ওপর থেকে ঝরনার মতো জল এসে পড়ছে পুকুরমতো জায়গাটাতে। পাথরের ঘের এমনভাবে রয়েছে নদীর বুকে, যাতে ঘেরা অংশে জলের স্রোত আছেও আবার তত নেই যে ভেসে যাবে। একমানুষমতো গভীর নদীর অংশটা। স্বচ্ছ জলে রঙীন মাছের দল মহানন্দে খেলে বেড়াচ্ছে, যেন কেউ নিজের হাতে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে রাজকুমারী নন্দিনীর জন্য। দেখেই মন প্রসন্ন হয়ে উঠল রাজকুমারীর। অপালার হাত ধরে নামতে গিয়ে থমকে গেলেন তিনি। লোকটা তাকিয়ে আছে তার দিকেই। খালি পা। খালি গা। ধুতি পরা, মাথায় একটুকরো সাদা উড়নি গোল করে বাঁধা। চোখে নিষ্পাপ সরল দৃষ্টি। রাজকুমারী এক ঝলক সেদিকে দেখে নিয়েই অপালার দিকে চাইলেন। অপালাও বুঝে গেল। সে বলল, “কিন্তু তুমি এখানে থাকলে আমরা স্নান করব কী করে?”

“তাও বটে! আচ্ছা, এই নাও, আমি পিছু ফিরে বসলাম।”

ওর ধরন-ধারণ দেখে রাজকুমারীর হাসি পেল। কিন্তু তিনি গম্ভীর হয়ে রইলেন। অপালার দিকে কপট রাগে চাইলেন। অপালা চেঁচিয়ে বললে, “এই যে, খবরদার এদিকে চাইবে না। আর বাপু এখানে বসাই বা কেন? তফাত যাও না কেন! আর তোমার কি কোনও কাজ নেই?”

“বা রে! আমি স্নান করব না বুঝি?”

“তা যাও না বাপু অন্যত্র।”

অন্য দিকে ফিরেই কথা বলতে লাগল বাউন্ডুলে লোকটি। তার রকমসকম দেখে অপালারও হাসি পাচ্ছিল। তবুও সে সামলে রইল। লোকটিও তফাতে গিয়ে বসল। কথাবার্তার মধ্যেই দুই সখী জলে নেমে এল। আর চমৎকার ঠান্ডা জল তাদের গা জুড়িয়ে দিল। নদীর মধ্যে এমন সুন্দর জায়গায়, ছায়াছায়া বাগানের মতো, দারুণ ভালো লাগায় লোকটির কথা বেমালুম ভুলে গেল তারা।

এদিকে সেপাইরা চিন্তিত হয়ে পড়েছে। রাজকুমারীর ভালোমন্দ কিছু হলে তাদের তো আর রক্ষে নেই। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে দেখে রাজকুমারীর বারণ সত্ত্বেও তারা রওনা দিল যেদিকে রাজকুমারী গিয়েছিলেন সেইদিকে। চলতে চলতে স্নান করার জায়গায় এসে পড়ল সেপাইরা। দূর থেকেই দেখতে পেল রাজকুমারী আর তার সখী জলে নেমেছেন, জল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছেন চারদিকে – ঠিক যেন দুটি হাঁস। তারা নিশ্চিন্ত হল। কিন্তু ও কী! কিছুদূরে একটা লোক পাথরের উপরে উল্টোমুখ করে বসে তাদের দিকে তাকিয়েই হাসি হাসি মুখে বসে রয়েছে। দেখেই তো সেপাইরা গেল তেড়ে। আর লোকটি অমনি লাফ দিয়ে পাথর থেকে নেমেই সোজা দিল ঝাঁপ নদীতে। রাজকুমারী আকস্মিক এই ঘটনা বুঝে ওঠার আগেই সেপাইরা নদীর জলে নেমে পড়েছে। কিন্তু অত স্রোতে তারা কি আর এগোতে পারে? অথচ লোকটি ঠিক কেমন করে স্রোতে ভেসে সাঁতরে সোঁ সোঁ করে চলে গেল অনেকটা দূর, তারপর জল থেকে যেমন পানকৌড়ি সটান উঠে যায় ডাঙায় তেমনি অন্য পাড়ে উঠে গেল। রাজকুমারী আর তার সখী অপালা তাকিয়ে রইল সেইদিকে। তারপর তাদের সম্বিত ফিরল। রাজকুমারী খুব বকলেন সেপাইদের। সেপাইরা মাথা নিচু করে রইল। সেদিনের মতো রাজকুমারী ফিরে চললেন তার তাঁবুর দিকে। পরদিন আবার গেলেন। তার পরদিন আবার। সেই একই জায়গায়। নদীতে নেমে জল ছিটিয়ে স্নান করলেন। পাথরের ওপরে চুপটি করে বসে রইলেন, গাছের ডাল দিয়ে বালির ওপর আঁকিবুঁকি কাটলেন, ফুলপাতাভরা ডাল নিয়ে মাথায় মুখে বুলিয়ে নিলেন। এদিক ওদিক তাকালেন কতবার। নদীর ওপারে চাইলেন কতবার। অথচ সেই লোকটিকে দেখা গেল না। স্নানে যেন সেই প্রথমদিনের মতো মজা আর কিছুতেই এল না। মাছেরাও যেন কম চঞ্চল, মনমরা, গাছেরাও যেন চুপ করে গেছে, নদীর স্রোতও যেন আর ততখানি খরতর নেই। কে জানে রাজকুমারীর মনের ভুল কি না।

এদিকে হল কী, সেই বাউন্ডুলে মানুষটি তো বেশ বুঝতে পেরে গেছে যে যাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল তারা যে সে মেয়ে নয়। একেবারে রাজপ্রাসাদের রাজকন্যা। বাউন্ডুলে লোকটি আশ্চর্য হল, কিন্তু ভয় পেল না। সেপাইরা তাকে ছুঁতেও পারবে না, সে জানত। অথচ তার কৌতূহল হল খুব। কে এই রাজকুমারী? কোন দেশেরই বা রাজকন্যা তিনি? আসলে সে তো কোনওদিন রাজকন্যা দেখেনি। তার দেশে তো রাজকন্যে বলে কোনও পদার্থ নেই। হুকুম তামিল করার জন্য কেউ কিছু করে না। সকলেই আনন্দ করে সব কাজ করে। চাষবাস, লেখাপড়া, রাস্তাঘাট বানানো, লেখাজোকা, নাচগান সবেতেই দেদার ফুর্তি। এটা কোরো না ওটা কোরো না বাধা-নিষেধের বেড়া, সত্যি বলেতে কী, একটু কমসমই তার দেশে। ফলে তার খুব কৌতূহল হল, জানতে তো হবেই। শেষে চারদিনের দিন যখন রাজকুমারী হঠাৎ করেই হুকুম দিলেন ফেরা যাক, লোকটিও পিছু নিল তাদের। সেপাইরা তো তাকে ভালো করে দেখেইনি, ফলে চিনবেই বা কী করে। রাস্তায় তো আর পথিকের অভাব নেই! মলিন বেশে সাধারণ মানুষটিকে কেই বা আর খেয়াল করে! রাজকুমারীর সঙ্গের লোকেদের সঙ্গে যাত্রার সুরাহা হবে বলে অনেক পথিক-সওদাগর-সাধারণ মানুষ জুড়ে গিয়েছিলেন। সুতরাং, খুব সহজেই মানুষটি লোকলশকরের ভিড়ে দিব্যি মিশে গেল। আর তিনদিন তিনরাত পর অবশেষে এসে পৌঁছলেন রাজধানী সম্যুক্তপুর।

রাজধানীতে কত লোক, পেয়াদা, পাইক বরকন্দাজ। বাজার এলাকা, দোকানপাট হাঁকডাক। পথিক লোকটির সাদা পোষাক, নীল উড়নি বাঁধা কোমরে। মাথায় নীল কাপড়ের পাগড়ি। সারাদিন এদিক ওদিক রাজপ্রাসাদের আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি শেষে রাজপ্রাসাদের তিনমহলার ওপরে রাজকুমারীর ঘরের হদিশ মিলল। সেখানে প্রকান্ড জানালা। জানালায় রেশমি কাপড়ের পর্দা। কিন্তু রাজকুমারীকে তো দেখা গেল না। ক্রমে রাত এক প্রহর হল। কোলাহল থেমে এল। আলো জ্বলতে লাগল প্রাসাদের সর্বত্র। জানালায় আলোছায়ায় যেন কাকে দেখা গেল! পথিক একঠায় চেয়ে রইল সেদিকে। রাত গভীর হল। রাতের খাওয়া সেরে তার খাস মহলে এলেন রাজকুমারী। তারপর রাজকুমারী তো গেলেন ঘুমোতে।

এদিকে সেই ভিনদেশের পথিকের তো ঘুম আসে না। রাজকুমারীর জানালার নিচে বসে একঠায় সে তাকিয়ে রইল গালে হাত দিয়ে। ধুলোতে আঁকিবুঁকি কাটল কত। শুকনো পাতায় লিখল পদ্য। হাওয়ায় রাজকুমারীর নাম লিখল কতবার, নাক উঁচু করে টেনে নিল রাজকুমারীর গায়ের সুবাতাস। রাজকুমারী তখন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন। রাত কখন ভোর হয়ে গেল পথিক টের পেল না। সে তখন পথের পাশে গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে কাদা। তার মাথার নিচে পাগড়ির বালিশ। ঘুমের মধ্যে হাওয়ায় লেখা রাজকুমারীর নাম, শুকনো পাতায় লেখা পদ্য সব একে একে গিয়ে ঝরা শিউলির মতো ঝরে ঝরে পড়ল সারারাত রাজকুমারীর আশেপাশে।

ঘুম ভেঙে রাজকুমারী দেখেন, তার চারপাশ জুড়ে পড়ে আছে কত কত অজানা পংক্তির এক কথা দুই কথা আর ঝুরো পাতায় লেখা পদ্যসকল। আরও দেখলেন রাজকুমারী, পথের পাশে নীল কাপড়ে মাথা ঢেকে কে একজন শুয়ে আছে। তার জানালা থেকে দূরে স্পষ্ট দেখা গেল তাকে। মুখটা যেন কেমন এক ঝলক চেনা চেনা। এতটা দূর থেকে ঠাহর হল না ঠিক। সেপাই ডাকবেন ভেবেও শেষ অবধি রাজকুমারী নিজেই হেঁটে হেঁটে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে নেমে চললেন তার কাছে। কৌতূহল ছিল তার। কে এমন পথের আধখানা জুড়ে শুয়ে থাকে? তার কি ঘর নেই? চুরি ডাকাতির ভয় না হয় নেই, তা বলে কি খোলামেলা এমন থাকতে হয়? কেন যেন নন্দিনীর তাকে চেনা মনে হয়। তবে কি… আবছা একটা মুখ মনে এসেই মিলিয়ে যায়। দেখেন পথিকের উলোঝুলো চুল, মলিন পোষাক। রাজকুমারীর মায়া হল। তিনি ঝুঁকে পড়ে জাগালেন ওকে। তারপর বললেন, “এস।”

ঘুম ভেঙে পথিক দেখল তার সামনে রাজকুমারীর ডাগর দুটি চোখ। সে উঠে বসতেও ভুলে গেল। তারপর রাজকুমারী যখন বললেন, “কই, এস!” অমনি সে চটকা ভেঙে কোমরের কাপড় খুলে মুখ মুছে উঠে বসল। তারপর কথাটি না বলে চলল রাজকুমারীর সাথে। রাজকুমারী তাকে নিয়ে এলেন তার মহলে। সেখানে সাদা পাথরের ফোয়ারা। বাগানে ময়ূর-ময়ূরী, মখমলি সবুজ ঘাসে ছাওয়া বাগান। গাছে গাছে ফল, ডালে ডালে রঙবেরঙের পাখি। সূর্যের আলোয় সোনার কাজ করা জাফরিগুলো ঝকঝক করে হেসে উঠছে। বাঁধানো বসার জায়গায় সবুজ পাথরের কারুকাজ। মানুষটাকে কতরকম ফলমূল যে খেতে দিলেন রাজকুমারী! হুকুম দিলেন সোনার থালায় ভাত বেড়ে দিতে। পঞ্চব্যঞ্জনে সোনার বাটি সাজিয়ে দেয়া হল। পথিক অবাক হয়ে গেল এত আদর-আতিথ্যের জন্য। সে তো সামান্য মানুষ। সে ভেবেছিল রাজকুমারীরা কেমন হয় তা দেখবে। আর কিছু নয়। রাজপ্রাসাদ, রাজামশাই, রাজকুমারি এ তাবৎ বইতে পড়েছে সে। চাক্ষুষ করেনি। সেই কৌতূহল তাকে তাড়িয়ে এনেছিল। কিন্তু তার জন্য রাজকুমারীর কেন এত যত্ন আত্তি কেন! রাজকুমারীকে দেখে অবধি তার মনে মুগ্ধতা ছেয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা তো রাজকুমারীর জানবার কথা নয়। খেয়েদেয়ে উঠে এইসব ভাবতে ভাবতে মুখ ধুয়ে উঠে সে দেখতে পেল অপালাকে, অবিশ্যি তার নাম জানত না। তবে নদীর পাড়ে একেই সে রাজকুমারীর সাথে দেখেছে। অপালা হাসল। সেও হাসল। অপালা তার কাছে এসে বড়ো বড়ো চোখ মেলে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার নাম কী?”

“আমার নাম সুতীর্থ।”

“তাই বুঝি!” বলে মুখ টিপে হেসে চলে গেল অপালা।

সুতীর্থ সারাদিন প্রাসাদের এখানে সেখানে ঘুরল ফিরল। কেউ তাকে আর কিছু বলল না, জিজ্ঞাসাও করল না, বাধাও দিল না। সেও মহানন্দে ঘুরে ঘুরে দেখলে, একে ওকে প্রশ্নে প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল, তারপর যেমন এসেছিল অমনিই দিনশেষে বিদায় নিল হেসে। তখন তার চোখ আরও উজ্জ্বল, রাজমহলের খুঁটিনাটি এখন সে বেবাক জেনে নিয়েছে। কিন্তু রাজকুমারী? তাকে যে জানা হল না!

রাজকুমারী খবর পেলেন, লোকটি ফিরে গেছে। তিনি তার প্রাসাদের ভেতরে নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে ফিরে সেকথা ভাবতে ভাবতে আয়নার সামনে বসলেন। সুমুখে তাকালেন। তাকিয়েই আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তার গায়ের পোষাক কখন বদলে গিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে রয়েছে হাজার হাজার গাছের পাতা। তাতে নীল রঙের কালিতে লেখা কবিতা। মানুষটা কি জাদুকর?

রাজামশাই সম্যুক্ত চান তার দরবারের কাজেকর্মে তার একমাত্র রাজকন্যা নন্দিনী পারদর্শী হয়ে উঠুন। তো সেইমতো রাজকুমারী তো গিয়ে বসলেন রাজসভায়। বিশেষ সভা শুরু হবে আজ থেকে। দেশবিদেশ থেকে কত লোক এসেছে, কত জ্ঞানীগুণী মানুষ। কত কথা। ভারী ভারী। দেশের জন্য, দশের জন্য। রাজকুমারীর ঢের কাজ। রাজাও অনেকটা নির্ভর করেন রাজকুমারীর ওপরে। তাই দায়িত্বও অনেক। রাজকুমারী ভারি ব্যস্ত।

ওদিকে সুতীর্থর কোনওই ব্যস্ততা নেই। সে তো তার পাগড়ি খুলে রেখেছে। অনেক দূরে মাঠের পাশে এক বিরাট গাছের ছায়ায় গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছে সে। আর তার কোনও তাড়া নেই। পাতা খসে পড়ে তার চারপাশে, তারপর তারাই রঙিন প্রজাপতি হয়ে উড়ে যায়। ছোট্টো পাখি হয়ে শিস দিতে দিতে উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসে। ঘুমের মধ্যে সুতীর্থ নন্দিনীর পায়ের শব্দ শোনে। ফুল এসে পড়ে কোলের ওপর। রাজকুমারীর গায়ের গন্ধ পায়। হাওয়া দেয়, রাজকুমারীর আঁচলের ছোঁয়া পায়।

কাজের ভিড়ে রাজকুমারীর হাত ছুঁয়ে যায় নীল রঙের উত্তরীয়। চোখের সামনে স্পষ্ট হয় এক অবিন্যস্ত মুখ। চমকে ওঠেন নন্দিনী, তারপর আবার সম্বিত ফিরে প্রবলভাবে দরবারের কাজে মন দেন।

বেলা বেড়ে চলে। বেলা গড়াতে থাকে। রাজকুমারী কাজে ডুবে থাকেন। পথিক ঘুমিয়ে থাকে। রাজকুমারীর একজন সেপাইকে পাঠান। সেপাই উঁকি মেরে দেখে এসে বলে সে লোক নেই। সেপাই কী করে জানবে, প্রাসাদের পাশ থেকে সরে মানুষটা দূরের পথে পাড়ি দিয়েছে! রাজকুমারী শোনেন। দরবারের কাজ মধ্য গগনে। দম ফেলার ফুরসত নেই। রাজকুমারী আরও নিবিড় হয়ে কাজে ডুবে যান। পথিকের মুখ আবছা হয়ে তার বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে। তার নামটাও যে জানা হয়নি তার। অপালাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, ভাবেন তিনি।

অনেক্ষণ সভা চলার পর রাজকুমারী প্রাসাদের বাগানে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গী অপালা। সভাকক্ষের বাইরে প্রাসাদের মধ্যে শুকনো পাতায় ঢাকা পায়ে চলা পথ। পাথরে বাঁধানো। “আমি একটু একলা হাঁটতে চাই,” বলে একলাই গাছের ছায়াঘেরা পথে নেমে এলেন উনি। একটা পাখি ডাকছে কুরর কুরর ডুউউ ডুউউউ করে। পাখিটাকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেটাকে চেনেন। ওর নাম বসন্তবৌরি। সবুজ রং, ঝুঁটিতে লালের ছোঁয়া। এসময়টা ওদের বাসা বানানোর। রাজকুমারীর নিজের মহলের কথা মনে পড়ল। তার মহলের পাশে ঝিল। ঝিলের পাশে বাগান, সেখানেই দেখেছেন পাখিটাকে। সজনেগাছের কোটরে বাসা বেঁধে সঙ্গীনীকে ডাকে পুরুষ পাখিটি। আরও অনেক পাখি উড়ে বেড়ায় রাজকুমারীর বাগানে। একটু উদাস হয় রাজকুমারীর মন। এরই মধ্যে ডাক আসে। প্রহরী এসে দাঁড়িয়েছে শশব্যস্ত। সভাকক্ষের বারান্দায়। পায়ে পায়ে ফিরতে থাকেন রাজকুমারী। অপালাকে এখনও জিজ্ঞাসা করা হল না।

১০

আনমনা হয়ে ফিরে এসে নিজের জায়গায় এসে বসলেন রাজকুমারী। সামনের দোয়াতে কলম ডুবিয়ে নিতেই একজন এগিয়ে দিলে তুলোট কাগজ। রাজকুমারী আনমনে আঁকিবুঁকি কাটতে থাকতে কত কথা ভাবতে থাকলেন উনি।

মনে পড়ে গেল, এক সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে প্রাসাদের পেছনদিকের নির্জন রাস্তায় চলে গিয়েছিলেন। কেউ চিনতে পারেনি রাজবেশ ছিল না বলে। সেদিন দেখেছিলেন অমন এক বাউন্ডুলে লোককে। তার উলুঝুলু পোষাক, মায়ামায়া চোখ, গভীর দৃষ্টি। তার হাতে রাজকুমারী তুলে দিয়েছিলেন কলম। অমনি কবিতা লিখে তার হাতে তুলে দিয়েছিল মানুষটি। এই লোক আর সেই লোক কি একই মানুষ! সেদিন অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে গিয়েছিল তার মন। যেন বহুদিন চেনেন ওকে। জাদুকর যেন। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার অজান্তেই। আজ আবার মনে পড়ে গেল। সভার জানালা দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটা কাগজটা উড়িয়ে দিলেন রাজকুমারী। তিনি নিশ্চিত জানেন সেটা ভেসে ভেসে পৌঁছে যাবে সেই লোকটির কাছে যার মাথায় নীল রঙের কাপড় বাঁধা। দু’চোখে পাহাড়ের নির্জনতা। আঁকিবুকির মধ্যে সে নিশ্চয়ই পড়ে ফেলতে পারবে রাজকুমারীর মনের কথা।

হঠাৎ একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন নন্দিনী। হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। হাত লেগে দোয়াত গেল সরে। খিদমতকারীরা ছুটে এল। হাত তুলে ওদের থামালেন তিনি। তারপর আবার ডুবে গেলেন সভার কাজে।

১১

রাজকুমারীর উড়িয়ে দেয়া চিঠি উড়তে উড়তে পৌঁছল গিয়ে পথিক লোকটার কাছে। গাছের নিচু ডালে এসে সেটা গেল আটকে। সুতীর্থ সেটা ডাল থেকে ছাড়িয়ে দেখল তাতে আঁকিবুঁকির মধ্যে রাজকুমারীর মনের কথাটি। সে ভারি মমতায় কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিল তার মাথার নীল কাপড়ের ভাঁজে। এদিকে তক্ষুনি হঠাৎ রাজকুমারী নন্দিনীর বুক কেঁপে উঠল। তিনি ভারি আশ্চর্য হলেন। তার মনে হল, তার হাতে কেউ হাত রেখেছে পরম মমতায়। রাজকুমারী ভুলে গেলেন সভার কাজ। একলাই বেরিয়ে এলেন খোলা আকাশের তলায়। অভিমান-ভালোলাগা-দুঃখ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছিল তার বুকের ভেতর। কাউকে বুঝতে না দিয়ে শান্ত পায়ে তিনি একলাই ফিরে চললেন মোতিমহলে, তার খাস কামরায়। আকাশে অল্প মেঘ, বাতাসে ফুলের গন্ধ, হালকা বাতাসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই মানুষটির সাথে মনে মনে কথা বলতে থাকলেন নন্দিনী। তার মন কেবল দ্রব হয়ে আসতে থাকল। রাজকুমারী ভাবতে থাকেন কেন এমন হল! তিনি তো তার রাজপাট নিয়ে বেশ ছিলেন। রাজরাজরাও কম তো দেখেননি। অজানা নদীপাড়ের লোকটির মতো এমনভাবে তার মনে তো দাগ কাটেনি কেউ। কেমন একটা ভালো লাগার বোধ তাকে ঘিরে। এদিকে রাজকুমারীর অজানা পথিক লোকটি মনে মনে শুনে চলেছে রাজকুমারীর পায়ের শব্দ, অস্ফুটে বলা কত কথা, শুনতে শুনতে চোখ বুজে আসে তার। ছায়ার মধ্যে ছায়া হয়ে চুপ করে যায় সে। রাজকুমারীর চিঠির মধ্যে নিজেকেই পড়তে থাকে সে।

বেলা পড়ে এল। রাজকুমারীর সভার কাজে আর মন নেই। তবুও ফিরে গেলেন সভায়। মূল কাজ অবশ্য আগেই হয়ে গিয়েছিল। এখন শুধুই জ্ঞান-তর্ক। রাজকুমারী আনমনা হয়ে হয়ে যান। সেপাই পাঠিয়ে জেনে নিয়েছেন বাউন্ডুলে লোকটি চলে গেছে। অনির্দিষ্ট পথে তার যাত্রা আরম্ভ হয়েছে বুঝিবা। রাজকুমারীর মুখে উদাসী হাওয়া খেলা করে। অমাত্যরা এসে খোঁজ নেন।

১২

এদিকে সুতীর্থ তার ঝোলা নিয়ে চলতে শুরু করেছে। রাজকুমারী নন্দিনীর গলার স্বর তার কানে বাজতে থাকে। কই রাজকুমারী তো বলেননি কিছু, অথচ কত কথাই যে সে শুনেছে! বুকের ভেতরে যেখানে ঢাকা পড়ে থাকে প্রীতি, সেইখানে রাজকুমারীর কথা গান হয়ে বাজে। সে বুঝে নেয় তার চলার পথ রাজকুমারীর পথের সাথেই মিলেছে হয়তো কোথাও। এখন তাকে যেতে হবে প্রাচীন পৃথিবীর পথে। রাজকুমারী যেন বললেন… শুনতে পেল যেন কেবল সুতীর্থ, চিরপথিক। তার মলিন বসন হয়ে উঠল উজ্জ্বল। মাথায় বাঁধা কাপড় হয়ে উঠল মুকুট। রাজকুমারীর চিঠি বুকে করে সে এবার পথে নেমে এল। সঙ্গে রইল শুধু এক অঞ্জলি ফুল। সমস্ত সুর নীল রঙের অক্ষরে রাজকুমারীর কাছে রেখে এসেছে সে। এইবারে অনির্দেশ্য যাত্রা শুরু হবে। যে পথের শেষে রাজকুমারী নন্দিনীই থাকবেন, তার অপরূপ দৃষ্টি মেলে।

1 Comment

  • I was very happy to find this internet-site.I wanted to thanks on your time for this glorious read!! I definitely having fun with every little bit of it and I have you bookmarked to take a look at new stuff you blog post.

Leave a Comment

Please wait...

Subscribe to Our Newsletter

Want to be notified when our article is published? Enter your email address and name below to be the first to know.