ভালবাসা, মান-অভিমান আর খুনসুটি

আবির সকালে ঘুম থেকে উঠে ডাটা অন করল, কাল ওর ভাইয়ের হবু বউয়ের ছবি পাঠানোর কথা ইমো’ তে। ইমো’তে ওর ভাইয়ের মেসেজ চেক করতেই একটা মেয়ের ছবি দেখতে পেল ও। বড় ভাইয়ের হবুনির ছবি দেখে ওর এভাবে চমকানোটা হয়ত ঠিক নয়, কিন্তু ওর জন্য হয়ত ঠিক। হয়ত এমন কিছুই আশা করেছিল ও, কেননা ওর ভাইয়ের হবুনি আর কেউ নয়, ওর এক সময়ের ভালবাসা মৌ।

ছবিটা দেখেই ওর ভার্সিটি লাইফের জীবনটা ভেসে উঠল, কি সুন্দর আনন্দময় জীবন ছিল! বন্ধু-বান্ধব, জুনিয়র, সিনিয়র, টিচার!ক্যাম্পাস! মধুময় একটা জীবন! আর সেই জীবনে এসে যুক্ত হয়েছিল মৌ’য়ের ভালবাসা!

মৌ ওর দুই বছরের জুনিয়র ছিল। প্রথম দেখাতেই ভালবেসে ফেলেছিল মৌ’কে, তবে এই ভালবাসাটাকে সত্যি করতে ওর আর ওর বন্ধুদের পুরো ৫মাসের মতো সময় লেগেছিল। মৌ ৫মাসের মাথায় আবিরের ভালবাসার কাছে হেরে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। বড্ড লাজুক প্রকৃতির মেয়ে ছিল মৌ, ওর বন্ধুদের সামনে কখনওই আবিরের সাথে কথা বলত না। আবার আবিরের সাথে কথা বলতে বলতে হুট করে ওর কোনো বন্ধু-বান্ধবী’কে দেখতে পেলে কিছু না বলেই আবিরের পাশ থেকে কেটে পড়ত। এর জন্য অবশ্য আবির বহুবার মৌ’কে বকা দিয়েছে, কিন্তু ওর এক কথা, কোনো বন্ধুর সামনে ও আবিরের সাথে কথা বলতে পারবে না। এক সময় মৌ’য়ের এই স্বভাবের সাথে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল আবির।
ভালই চলছিল আবির আর মৌ’য়ের অভিমানী ভালবাসা।

ওদের দুইবছরের প্রেম ছিল। যদিও মৌ’য়ের কিছু আচরণে আবির ওকে সন্দেহ করত, কিন্তু ভালবাসার কাছে ঐ টুকু সন্দেহ টিকতে পারেনি। আবিরের অনার্স কম্পলিট হতেই ওর বড় ভাই ওকে আমেরিকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওর ভাইয়া একটা ব্যাংকে চাকরি করে। আর ওর বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। ওর কোনো বোন নেই। তবে আবিরেরও যে ইচ্ছে নেই আমেরিকা যাওয়ার তা নয়, ওর নিজেরও ইচ্ছে ছিল আমেরিকা যাওয়ার, কিন্তু কয়বছর থাকার পর আবার দেশে চলে আসবে, এমন প্লান ছিল।

মৌ আবিরের বিদেশে চলে যাওয়াটা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। দেখতে দেখতে আবিরের দেশ ছাড়ার দিন এগিয়ে আসছিল। আমেরিকা যাওয়ার ঠিক আগের দিন আবির মৌ’য়ের সাথে দেখা করতে যায়। মেয়েটাতো কেঁদেকেটে একাকার। আবির ওকে শান্তনা দিচ্ছিল…

_দেখো আমিতো একেবারের জন্য চলে যাচ্ছি না। কিছুদিন পরেই চলে আসব। আর ওখানে গিয়ে সব সময় তোমার সাথে যোগাযোগ করব। এতো চিন্তা করছ কেন!

_সে তুমি বুঝবে না। তুমিতো আর আমার মতো মধ্যবিত্ত নও, ইচ্ছে হলে ওখানে হাজারো মৌ পাবে। আমাকে ভুলে যাবে!
_ধুর পাগলের মতো কথা বলো না। হাসিমুখে বিদায় দিবেনা!

এরপর স্বাভাবিক ভাবেই সেদিন আবির মৌ’য়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসল। পরেরদিন যেন মৌ এয়ারপোর্ট যায়, আবিরের এই একটাই অনুরোধ ছিল। যদিও প্রথমে মৌ রাজি হচ্ছিল না, পরে আবিরের জোরাজুরিতে রাজি হয়ে যায়।

আবির এয়ারপোর্ট এ এসেই মৌ’কে খুজতে থাকে। অনেক খুঁজাখুঁজির পর ও ওর কবির ভাইয়ের সাথে মৌ’কে দেখে ফেলে। ও প্রথমে ভাবে যে হয়ত এমনিতেই পরিচিত তাই কথা বলছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন মৌ ওর সাথে কথা না বলেই চলে যায় তখন ওর মনের মধ্যে একটা ভয় হয় মৌ’কে হারানোর। ও আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মৌ’য়ের জন্য কিন্তু মৌ আসেনা।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়স্বজনদের বিদায় জানিয়ে আবির বিদেশের পথে পা বাড়ায়।
নতুন পরিবেশে সবাইকে ছাড়া থাকবে ভাবতেই ওর খারাপ লাগে। মৌ’কে কল করার আগে ওর এক ফ্রেন্ড ওকে জানায় যে মৌ নাকি এয়ারপোর্ট এ এসে আবিরের বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলেই চলে গেছে, আবিরের সাথে দেখা করেনি, ওরা অনেকবার বলেছিল বাট মৌ কারো কথা শোনেনি।

কথাটা শুনে আবির নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনা। ও ভাবে হয়ত ওর বড় ভাইয়ের সাথেই মৌ’য়ের সম্পর্ক আছে। কথাটা ওর বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও কয়দিন পর ওর বন্ধু রিফাত জানায় যে মৌ নাকি এখন মাঝেমাঝেই আবিরদের বাসায় যায়, কিন্তু তারপরেও মৌ আবিরের নাম্বার নিয়ে কল করেনা কেন!

সন্দেহ যেন সত্যি হয়ে ধরা দেয় আবিরের কাছে, ফোন দেওয়ার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ফোন দেয় না মৌ’কে।
এইভাবেই ৩ বছর কেটে গেছে। এই ৩বছর আবির ফেসবুক ইউজ করেনি। আর মৌ’কে অনেক আগেই ব্লক করে দিয়েছে। ও ওর কবির ভাইকে অনেক ভালবাসে, ও চায়না ওর জন্য কবির ভাই কোনো কষ্ট পাক। মৌ ওকে ঠকিয়েছে দুঃখ নেই, কবিরকে যেন না ঠকায় তাই ইচ্ছে করেই মৌ’কে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে।

কাজের চাপে মৌ’কে হয়ত ভুলেই যেত, কিন্তু এখন মৌ’য়ের ছবি দেখে ওর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ওর সন্দেহটা যে একদম সঠিক তা প্রমাণিত হলো।

ওর মা ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ওর মায়ের মধুর কন্ঠটা শুনতে পেল…
_বাবারে তোর ভাইয়ের জন্যতো মেয়ে দেখা শেষ, আমি চাচ্ছি তোদের দুই ভাইয়ের বিয়ে একসাথে দিতে, বয়স হইছে, কখন কি হয়!
_মা তোমাকে না কতবার বলেছি এইসব আজেবাজে কথা বলবে না। আর ভাইয়ার বিয়ে হোক, আমি পরে করব, এতো তাড়া কিসের!
_আমি অতশত বুঝিনা, তোর কোনো পছন্দ থাকলে বল। নইলে আমরাই দেখছি।
_আচ্ছা তোমরা সব ঠিক করো, আমি বিয়ের দুই-একদিন আগে আসব।
_সে কি! দুই ভাইয়ের বিয়ে, কত কাজ, আর তুই না আসলে হয়!
ওর মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই ওর ভাই কথা বলতে শুরু করল…
_আচ্ছা তুই বিয়ের আগের দিন আসলেও হবে। তবে মেয়ের সাথে দেখা করলে ভালো হতোনা?
_ভাইয়া আমার কিছুই করতে হবেনা, তোমরা মেয়ে পছন্দ করে রাখো আমি এসে শুধু বিয়ে করব। আর মেয়ে যদি দেখা করতে চায় আমার ছবি দেখিয়ে দিও।
_আচ্ছা, ভালোভাবে আসিস। এখানে আমি সব সামলে নিচ্ছি।
_আচ্ছা ভাইয়া। থ্যাংকইউ।
_হুম।

আবির বিয়ে করবে বললেও ওর মন সায় দিচ্ছেনা। কিন্তু পরিবারের সুখের জন্য ওকে এতটুকু ত্যাগ করতেই হবে।
সত্যি করেই আবির বিয়ের একদিন আগে আসল। কাল ওর বিয়ে অথচ ও বিদেশ থেকে এসে কারো সাথে তেমন কথাও বলছে না, ক্লান্ত আছে বলে সবাইকে এড়িয়ে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ও ভাবতে পারছে না কাল কি হতে চলেছে। মৌ’কে নিজের ভাবি হিসেবে ও মেনে নিতে পারবেতো! এসব চিন্তা করতে করতে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় আবির।

সকাল সকাল কবির আবিরকে ডাকতে থাকে, বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। ২ছেলের বিয়ে একসাথে বলে কথা! কে কার সাথে বরযাত্রী যাবে তাই নিয়ে আলোচনা চলছে, আবিরের ওসব দিকে মন নেই।

গোসল সেরে, শেরওয়ানী পড়ে দুই ভাই রেডি। মা-বাবাকে সালাম করে আরো মুরুব্বিদের থেকে বিদায় নিয়ে দুই ভাই দুইদিকে রওয়ানা দিল।

আবিরের মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়ির সবাই ওর পরিচিত। ওর ফ্রেন্ডদের ছাড়া আর অন্য কাউকে ও ইনভাইট করেনি ও, তার মানে ওর ভাই ক্যাম্পাসের আরো অনেককে ইনভাইট করেছে। যাইহোক ওদিকে ওর তেমন মন নেই।

বিয়ে পড়ানোর সময় মেয়ের নামটা শুনে ও কিছুটা অবাক হলো, ফারহাতুল জান্নাত তো মৌ’য়ের নাম। কাকতালীয় ভেবে এ বিষয়টাও এড়িয়ে গেল।

কবিরের আগেই ও বাড়ি পৌঁছে গেল, কিন্তু রুমে গিয়ে বউয়ের মুখ দেখে ও অবাক! আরে এতো মৌ! তারমানে ওর ভাই চলে এসেছে ভেবে ভাইয়া ভাইয়া বলে ডাকতে লাগল। কিন্তু রুম থেকে বের হতেই জানতে পারল যে ওর ভাই এখনো আসেনি। তাহলে মৌ!

ও আবার রুমে যেতেই মৌ ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল…
_বাহ! ৩টা বছর ভালই কাটালে। আমিতো ভেবেছিলাম ওখান থেকে বউ নিয়ে দেশে ফিরবে!
_তুমি কাকে ঠকাচ্ছো? আমাকে? নাকি ভাইয়াকে?
_ছিঃ আবির! তুমি এমনটা ভাবতে পারলে!
_তাহলে সেদিন তুমি আমার সাথে দেখা না করে ভাইয়ার সাথে কথা বলেই চলে গিয়েছিলে কেন?
_কারণ ভাইয়া বুঝতে পেরে গেছিল তুমি আমাকে ভালবাসো, আমাকে বলেছিল তোমার সাথে দেখা করতে, আমি লজ্জায় সেদিন আর ভাইয়ার সাথে তোমার সামনে যেতে পারিনি। অনেক মানুষ ছিল….
_কিন্তু পরেতো আমাদের বাসায় গিয়েছিলে, আমার নাম্বার নিয়ে ফোন করতে পারোনি?
_হুম। গিয়েছিলাম, যখন দেখলাম তুমি আমাকে এফ বি থেকে ব্লক করেছো আর ফোনও করছ না, ভাবলাম কিছু একটা হয়েছে।
_তারপর! নাম্বার নিয়েছিলে না কেন?
_কবির ভাইয়া দেয়নি। বলেছিল এই কয়টা বছর তোমার জন্য অপেক্ষা করলে তবেই তোমাকে পাব, আর এর মধ্যে যদি তুমি যোগাযোগ করো সেটা আলাদা ব্যাপার।
_তারমানে কবির ভাইয়া….
_হুম।তুমি আমার খোজ নিতে না, কিন্তু আমি তোমার খোজ নিতে প্রায়ই তোমাদের বাসায় আসতাম।
_আমি সব জানি। আমি তোমাকে আর ভাইয়াকে ভুল বুঝেছিলাম।
_এতো সন্দেহ করো আমাকে?
_ভালবাসলে সন্দেহ করতে হয়।
_মিস করোনি আমায়?
_হুম। খুব। তবে এখন অবশ্য কিছুটা মানিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে।
_আমাকে ভাবি বলতে পারতে?
_খুব পারতাম। ভাবি….
_চুপ! এতদিন পর দেখা! ভাবতেই অবাক লাগছে।
_হুম। তুমিতো সব জানতে, আর আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।
_আর কখনো কারো জন্য তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করব না।
_হুম! তাহলে ধরে পিটাব।
_কি! আমাকে পিটাইবা!
_আমার বউ যা খুশি করব।
_আচ্ছা! আমার তাহলে কিছু বলার নেই!!!
_নেই মানে! আমি যা বলব তাই শুনতে হবে।
_আমার বয়েই গেছে!
শুরু হয়ে গেল ভালবাসা, মান-অভিমান আর খুনসুটি!!

1 Comment

  • I have been exploring for a bit for any high quality articles or blog posts on this sort of area . Exploring in Yahoo I at last stumbled upon this website. Reading this info So i’m happy to convey that I have a very good uncanny feeling I discovered just what I needed. I most certainly will make certain to don’t forget this website and give it a glance regularly.

Leave a Comment

Please wait...

Subscribe to Our Newsletter

Want to be notified when our article is published? Enter your email address and name below to be the first to know.