ভালবাসার খুনসুটি

এ এ এই আমার চুল ধরে কে টানে রে..? ও ও ও মা গো… বাঁচাও…

রিয়ার লম্বা চুলগুলো যখন বাতাসে শুকাতে বালিশ অতিক্রম করে খাট থেকে নিচে ঝুলছে ঠিক তখন নোমান ছোট্ট একটা ইঁদুর ধরে সুতো দিয়ে বেঁধে রিয়ার চুলের সাথে সুতোর একটা গিট্টু লাগিয়ে দিল।

গোসল করে খেয়েদেয়ে রিয়া চুল শুকাতে ফ্যান ছেড়ে এভাবে শুয়ে থাকে। এটা তার প্রতিদিনের স্বভাব।আজ ছুটির দিন হওয়ায় নোমান বাসাতেই আছে।বউ ঘুমায় কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই।কথা ছিল খেয়ে দেয়ে দুইজনে লুডু খেলবে কিন্তু মেয়েটা ঘুমিয়ে সব বানচাল করে দিল।তাই সে ইঁদুরের বুদ্ধিটা কাজে লাগিয়েছে।দারুণ কাজ হয়েছে।রিয়া চুলে কয়েকটা টান খেয়েই ঘুম থেকে উঠে চিৎকার শুরু করেছে।

নোমান চুপচাপ গুটিগুটি পায়ে ফ্রিজ থেকে একটা মিষ্টি নিয়ে দরজার পেছনে লুকিয়ে পড়ল।রিয়া দ্রুত ভয় পেয়ে চিৎকার দিতে দিতে চুল থেকে সুতোর গিট খুলে নোমান কে খুঁজতে লাগল।

:রিয়া মনে মনে বলতে লাগল নোমাইন্না তোরে আইজকা খাইছি।তুই কই লুকাইছোস বাইরা ফাজিল।কিন্তু রাগ চেপে সুমধুর কন্ঠে বলল,নোমান কই তুমি?আমি ইঁদুর খুব ভয় পাই।প্লিজ আমার কাছে একটু আসো(ষোলো কলার এক কলা প্রয়োগ)

:মনে মনে(হুম..আমি বাহির হই আর তুমি আমারে কিলাও! দরকার নাই সেইভ পজিশনে আছি,নিরবতা মাইর থেকে বাঁচার সর্বোত্তম পন্থা,চুপচাপ মিষ্টি খাই সেটাই ভালো)

:নোমান সত্যি বলছি কিছু করমু না,বাহির হও..

কথা শেষ হতে না হতেই রিয়া নোমানকে দরজার চিপায় দেখে মিষ্টি খাচ্ছে দাঁড়ায় দাঁড়ায়।দু’জনের চোখাচুখি হতেই নোমান বিপদের আঁচ পেয়ে দৌড়ে এসে অর্ধেক মিষ্টি রিয়ার হা করে কথা বলতে যাওয়া মুখে পুরে দেয়।রিয়ার কথা বলা বন্ধ।

:সরি রিয়া বিবি তোমাকে ঘুম থেকে উঠানোর আর কোন সহজ উপায় ছিল না।মিষ্টি খাওয়াইছি সুতরাং সোয়াবে আর পাপে কাটাকাটি হয়ে গেছে।ইঁদুর বাইরে ফেলে দিচ্ছি।তারপর কিন্তু আগের কথা মত লুডু খেলবো,নো ঘুম নো চিল্লাচিল্লি ওকে?

:নো ওকে,আমি প্রতিশোধ নেবো তারপর ওকে

কথা শেষ করতে না করতেই রিয়া তার হাতের লম্বা নখ দিয়ে নোমানকে খামচি দিতে গেলে নোমান সরে গিয়ে একটুর জন্য রক্ষা পায়।তারপর সে রিয়ার হাত দুটো ধরে ফেলে।রিয়া নিশ্চিত পরাজয় দেখে সন্ধি করতে রাজি হয়ে লুডু খেলতে বসে।নোমান রিয়ার জন্য কোল্ড কফি বানিয়ে নিয়ে এসে লুডু খেলা শুরু করে।

লুডু খেলতে খেলতে রিয়া মনে মনে বলে,চান্দু, ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে।তোমারে আমি ছাড়ুম না।

লুডু খেলায় নোমান হেরে গিয়ে মুখটা বাংলা পাঁচের মত করে ফেলে।তাই দেখে রিয়ার মনটা কিছুটা শান্তি পায়।

:রিয়া বিবি,জিতে তো গেলে এখন পুরস্কার নিবা না?
:কি পুরস্কার?
:চোখ বুজে হাত পাতো পুরস্কার দিচ্ছি
:না,পুরস্কার দরকার নাই।নিশ্চিত তুমি আবার ফাইজলামি করবা।
:আরেহ্ না,এমন একটা জিনিস দেব যেটা খেলে তুমি মোটা হতে পারবে।তুমি শুকনো বলে তোমার কত আফসোস না!
:সত্যি?
:সত্যি।
:আচ্ছা চোখ বুজলাম দেও..

নোমান স্যান্ডেলটা পায়ে দিয়ে দৌড় দেবার প্রস্তুতি নিয়ে পকেট থেকে টিকটিকির ছয়টা ডিম বের করে রিয়ার হাতে দিলো।অনেক কষ্ট করে এগুলো সে জোগাড় করেছে।রিয়া খুশি হয়ে তাকাতেই নোমান ভো-দৌড়

:একি!!টিকটিকির ডিম!এ্যাঁ মা ছি ছি!

জোরে চিৎকার করতে করতে রিয়া নোমানের পেছনে ছোটে।
:ওই নোমাইন্না দাঁড়া ফাজিল..

ভালবাসার মাঝে দুষ্টুমিটা হলো প্রান।এমন দুষ্টুমি আর খুনসুটি না থাকলে সম্পর্কটা পানসে হয়ে যায়।স্বামী, স্ত্রী একে অন্যের যেমন ভালবাসার মানুষ তেমনি বন্ধুও।তাই সম্পর্কের টানা পোড়েন কেটে যায় এমন মিষ্টি সম্পর্ক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

এক মাস পর…

নোমান গ্রামের বাড়ি এসেছে মামাতো ভায়ের বিয়ে খেতে।বাড়িতে অনেক আত্মীয় থাকায় নোমান রিয়ার এক সাথে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই।সুতরাং সাময়িক বিচ্ছেদের সুর বেজে উঠল।নোমান এবং তার তিন মামাতো ভাই মিলে একটা রুমে থাকার ব্যবস্থা হল।রিয়া মামী,নানী,শাশুড়ির সাথে থাকবে।

রাত বারোটা…

নোমান লুঙ্গীতে গিট্টু দিয়ে ঘুমায় ভাইদের সাথে।রিয়া থাকলে অবশ্য এত সাবধানতা অবলম্বনের দরকার হতো না।লুঙ্গী পরে ঘুমালে নোমানের লুঙ্গী সব সময় মাথায় এসে টুকি খেলে।

রিয়ার সবাই ঘুমানোর পর প্রতিশোধ নিতে ঘুমন্ত নোমানের লুঙ্গীর গিট্টু খুলে দিয়ে আসে।পাশে একটা চিঠি দিয়ে আসে, চিঠিতে লেখা ছিল,

“টিকটিকির ডিম আর ইঁদুর দেবার প্রতিশোধ…মু হা হা হা”।
-রিয়া-

ভোর চারটায় নোমানের হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়।রিয়াকে পাশে খুঁজতে গিয়ে তার মনে পরে সে ভাইদের সাথে ঘুমিয়েছে।কিন্তু একি!!তার গলায় গামছা প্যাঁচালো কে?আরেহ্ যা!এতো দেখি তার নিজের লুঙ্গী!!

ভাগ্গিস সবাই ঘুমিয়ে নিজেকে ঠিক করে সে মোবাইলের আলো জ্বালাতেই রিয়ার চিঠি পেল।ঠোটের কোণে হাসি ফুটে উঠল নোমানের।রিয়ার পরিকল্পনা একটুর জন্য বানচাল হয়েছে।সে রিয়ার রুমে যাবার জন্য বের হতেই দেখে রিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে..

:রিয়া পঁচা মেয়ে,এমন কাজ করা ঠিক না।
:সরি,এখন এসেছিলাম ঠিক করে দিতে।তোমাকে ছাড়া ঘুম এলো না,নোমান।
:আমারো ভালো ঘুম হয়নি।চল নামাজ আদায় করে ভোরের সকালটা দেখি হেঁটে হেঁটে একসাথে।
:আচ্ছা

ভোরের আলোয় ওদের পবিত্র ভালোবাসাটা আরো পবিত্রতা ছড়িয়ে চারপাশ আলোকিত করে দিতে লাগল।ভালো থাকুক পবিত্র বন্ধনগুলো দুষ্টুমি,নির্ভরতা,বিশ্বাস আর বন্ধুত্বের সুশান্তিময় ছায়াঘন ছায়াতলে।

Leave a Comment

Please wait...

Subscribe to Our Newsletter

Want to be notified when our article is published? Enter your email address and name below to be the first to know.