তোমায় আমার প্রয়োজন !!

হ্যালো জাহিদ
– জ্বি আসসালামু আলাইকুম স্যার
– ওয়ালাইকুম আসসালাম , জাহিদ তুমি কি অফিসে ?
– জ্বি স্যার এখনো অফিসেই আছি । কেনো স্যার ?
– তাওহীদ এর কোনো খবর জানো ?
– নাহ তো স্যার । তাওহীদ স্যার তো কাল সন্ধ্যায় বের হয়ে গেলেন
– ও এখনো বাসায় আসে নাই । আর এখন শুনলাম অফিসেও নাই
– স্যার তাহলে কি তাওহীদ স্যার আবারো ?
– তুমি খোজ নাও তো জাহিদ , আমি একটু পরে অফিসে ঢুকবো
– জ্বি স্যার

এতক্ষন ধরে মাহবুব সাহেব ওনার অফিসের স্টাফ জাহিদ এর সাথে কথা বলছিলো । জাহিদ যেমন অফিসের সমস্ত কার্যক্রমে এক্টিভ তেমনি মাহবুব সাহেবের পরিবারের খুটিনাটি তেও এক্টিভ । পুরো অফিসের মধ্যে মাহবুব সাহেব এই জাহিদকেই একমাত্র বিশ্বাস করেন । আসল ব্যাপার হচ্ছে গতকাল সন্ধ্যা থেকে আজ দুপুর ১২ টা পর্যন্ত মাহবুব সাহেবের ছেলে তাওহীদ কে পাওয়া যাচ্ছে না । সেই জন্যেই ওনার এতো টেনশন ।

– হ্যাঁ গো , কোনো খবর পেলে ?
– জাহিদ কে দিয়ে খোজ লাগিয়েছি , আশা করি খুব তারাতারি খবর পেয়ে যাবো ।
– আমি বার বার বলেছিলাম এইবার ছেলেটার একটা বিয়ে দাও বিয়ে দাও । কিন্তু তুমিও ছেলের সাথেই নাচতে বসে গেলে । শোক কাটিয়ে তুলতে গিয়ে আজ আমার ছেলেটা শেষ হয়ে যাচ্ছে ।
– আহ রাবেয়া থামো , এখন এসব বলো না । আগে তাওহীদ বাসায় আসুক , তারপর এইসব নিয়ে কথা হবে
– আমি বলে দিচ্ছি এইবার ছেলের বিয়ের ব্যবস্থা করো

ইনি রাবেয়া মাহবুব । মাহবুব সাহেবের স্ত্রী , তাওহীদ এর মা । বেচারি ইদানীং অনেক টেনশনে আছেন ছেলে কে নিয়ে । ছেলের এইরকম আচরণ মা হয়ে কিভাবে মেনে নিবেন তিনি । কিন্তু যাকে নিয়ে এতো আলোচনা সমালোচনা সেই তাওহীদ কেই তো দেখা যাচ্ছে না ।

– হ্যালো স্যার
– হ্যাঁ জাহিদ বলো , কোনো খবর পেলে ?
– জ্বি স্যার , তাওহীদ স্যার কাল রাতেও………
– আহ আল্লাহ , আর কত , এখন কোথায় সে ?
– ওনার বাঙলো তে , আমি নিয়ে আসতেছি আপনি কোন টেনশন নিবেন না স্যার
– সাবধানে এসো , আর অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে জাহিদ
– স্যার ধন্যবাদ এর জন্য এইসব করি নাকি আমি ? আপনি টেনশন নিয়েন না স্যার , আমি তাওহীদ স্যারকে নিয়ে ফিরছি ।
– আচ্ছা এসো

প্রায় এক ঘন্টা পর গাড়ি এসে পৌঁছায় “”ছায়া নিবাস”” এর সামনে । জাহিদ বহু কষ্টে তাওহীদ কে গাড়ি থেকে নামিয়ে দরজার কাছ অবদি আগায় তারপর দুইজন সার্ভেন্ট এসে তাওহীদ কে ধরে উপরে তার ঘরে নিয়ে যায় । হ্যাঁ এই হচ্ছে তাওহীদ । মাহবুব সাহেবের একমাত্র ছেলে এবং মাহবুব গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র উত্তরাধিকারী । যে সারাক্ষণ মদের নেশায় ডুবে থাকে । ড্রাগস এর অতল গহ্বরে যে ঢুকে গেছে , এই হচ্ছে সেই তাওহীদ মাহবুব ।

– জাহিদ কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ জানাবো আমি
– স্যার কিছুই বলবেন না , এইটা আমার কর্তব্য এইটা আমার দ্বায়িত্ব স্যার ।
– জাহিদ এইভাবে ছেলেটা কে শেষ হয়ে যেতে দিতে পারি না । আমি তো ওর বাবা , বাবা হয়ে কি করে ছেলের এই ধ্বংস দেখবো বলতে পারো বাবা ?
– স্যার , এত টেনশেন নিচ্ছেন কেনো ? উপরে যে বসে আছেন তাকে ভাবতে দিন । সে নিজেই এর ব্যবস্থা করে নিবে ।
– সেই অপেক্ষাতেই তো আছি
– স্যার অফিসে কি একবার আসবেন ? আসলে একটা মিটিং ছিলো ।
– হ্যাঁ আসতে তো হবেই , আমার তো সেই কপাল এখনো হয় নি যে ছেলে সব নিজ দ্বায়িত্বে বুঝে নিবে
– স্যার তাহলে আমি উঠি আপনি অফিসে আসুন , সেখানেই কথা হবে

জাহিদ চলে যাবার মাহবুব সাহেব গভীর চিন্তায় ডুবে যান । ছেলের এইভাবে শেষ হয়ে যাওয়া তাকে ঘ্রাস করে ফেলছে । যেই ছেলে তার ভার্সিটিতে টপার ছিলো , দেখতেও মাশা-আল্লাহ অনেক সুন্দর , সব দিক থেকে যে চোখে তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো , আজ সেই ছেলে তার মদ আর ড্রাগস এর নেশায় আহত । এইসব ভাবতে ভাবতে মাহবুব সাহেবের দু-চোখ ভেসে যায় জ্বলে ।
এমন সময় রাবেয়া বেগমের উপস্থিতি ঘটে সেখানে । স্বামীর চোখে পানি দেখে , বিচলিত হয়ে পড়েন তিনিও ,

– শুনছো
– হ্যাঁ বলো
– এইবার ওর একটা বিয়ের ব্যবস্থা করো
– বিয়ে বললেই হয় না রাবেয়া , ওর condition দেখছো তুমি , ওর ভেতরের সব টাই ঝাঝড়া হয়ে গেছে ড্রাগে । এমন ছেলেকে কে বিয়ে করবে আর কোন মেয়ের বাবা তার মেয়েকে এই ছেলের হাতে দিবে
– তাওহীদ তো সব সময় নেশা করে না
– তবুও , আমি কিভাবে জেনে শুনে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিবো বলতে পারো ?
– চেষ্টা করতে ক্ষতি কি ? এমনো তো হতে পারে বিয়ের পরে আমার ছেলেটা ভালো হয়ে গেলো
– আচ্ছা , বলছ যখন আমি খোজ করবো , দেখি কি করতে পারি , আমি অফিসে বের হবো ওকে দেখে রেখো
– আচ্ছা

মাহবুব সাহেব অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন আর রাবেয়া বেগম রান্না ঘরের দিকে , এমন সময় ছোট মেয়ে মাইশা এসে মায়ের পাশে দাঁড়ায় । হ্যাঁ মাহবুব-রাবেয়া দম্পতীর মেয়ে সে । তাওহীদ এর ছোট বোন , এইবার সবে মাত্র HSC দিলো সে । কিন্তু সেও মাশা-আল্লাহ অনেক বুদ্ধিমতী । কথা দিয়ে ভূবন ভোলানো এক মেয়ে ।

– আম্মু
– জ্বি
– ভাইয়া আজকেও ?
– হ্যাঁ রে মা
– আম্মু আমি বলি কি , ভাইয়ার একটা বিয়ে দাও , বউ থাকলে কিছুটা পরিবর্তন হবে হয়তো
– মা রে তোর আব্বুকে বলছিলাম , কিন্তু তোর আব্বু তো ?
– আব্বুর কথাও ঠিক , ও তো নেশার মধ্যে উবে আছে , যে ঠিক মত কথাই বলতে পারে না তাকে কে বিয়ে করবে আম্মু ?
– জানি না আমার ছেলের কপালে কি আছে

এইদিকে অফিসে এসেও মাহবুব সাহেবের শান্তি লাগছে না । স্ত্রীর কথাও ফেলে দেয়ার মত না । একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কোথায় ? এমন সময় মেয়ের ফোন আসে ।

– হ্যালো আব্বু
– হ্যাঁ মামুনি , বলো
– ব্যস্ত আছো ?
– না মামুনি বলো
– আব্বু , ভাইয়ার জন্য মেয়ে দেখো , এইভাবে রেখে দিলে ও আরো নিজেকে শেষ করে দিবে
– তোমার আম্মুও তাই বললো , দেখি মামুনি কি কর‍তে পারি
– আচ্ছা আব্বু রাখছি আমি
– শুনো , তোমার ভাই উঠেছে ?
– নাহ , উঠে নি
– আচ্ছা রাখো , রাতে এসে কথা হবে
– আচ্ছা

মেয়ের সাথে কথা শেষ করে আবার ভাবনায় বসেন মাহবুব সাহেব । কি করা যায় ? এইবার আর ছেড় দেয়া যাবে না । এইবার যা করার তাকেই করতে হবে ।
টেলিফোন হাতে নিয়ে জাহিদ কে চেম্বারে আসতে বলেন মাহবুব সাহেব ।

স্যার আসবো ?
– হ্যাঁ এসো জাহিদ , বসো
– কি ব্যাপার স্যার , এত জরুরী তলব
– জাহিদ একটা কথা ভেবেছি
– কি কথা স্যার
– তাওহীদ এর বিয়ে দিবো
– স্যার
– হ্যাঁ জাহিদ , আর উপায় নেই । তোমার আন্টিও চায় এইবার একটা বিয়ে দিয়ে দিতে ছেলেটার ।
– কিন্তু স্যার আপনি যেটা ভাবছেন সেটা কি আদৌ সম্ভব । কে বিয়ে করবে ওনাকে ? জেনে শুনে এমন মাতাল ছেলের জীবনে কে আসবে স্যার ?
– খোজ করতে হবে জাহিদ । তবে কোন বড়লোক ঘরের মেয়ে নয় , একদম নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে চাই আমার । যে আমার ছেলেকে বদলে দিতে পারবে ।
– কিন্তু স্যার………
– যার চেহারা কথা বলবে , যার চোখে থাকবে জ্বলে ওঠার শক্তি , যে হবে অদম্য সাহসে অধিকারীনি , যাকে হয়ে উঠতে হবে আমার ছেলের রক্ষাকবজ ।
– এমন মেয়ে পাবেন কোথায় স্যার ?
– খুজতে হবে জাহিদ , খুজতে হবে ।
– স্যার একটা কথা বলি ?
– বলো
– স্যার আমাদের ফ্যাক্টরিতে হেড হিসেবে যিনি আছেন না ওই যে আফরোজ ম্যাডাম
– হ্যাঁ , এখন কি হয়েছে
– আপনি চাইলে আমি ওনার সাথে কথা বলতে পারি , উনি তো সব ব্যাপারেই ভালো জানেন , উনি হয়তো ভালো কোন না কোন মেয়ের সন্ধান ঠিক দিতে পারবেন
– হ্যাঁ , ঠিক বলেছো তো , আমার তো ব্রেনেই আসে নাই ওনার নাম টা , ঠিক আছে আমি কাল ওনাকে অফিসে ডাকবো , দেখি কি বলে উনি
– ওকে স্যার

ভালো মেয়ের সন্ধ্যান পেলেই এইবার ছেলের বিয়ে টা সেড়ে ফেলবেন মাহবুব সাহেব । ছেলেকে নেশার কবল থেকে বাচানোর জন্য হয়তো এটাই উত্তম উপায় ।
পরদিন সকালবেলায় ,
খবরের কাগজ হাতে মাহবুব সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন , এমন সময় স্ত্রীর উপস্থিতি টের পেয়ে সামনে তাকান তিনি

– কিছু বলবে
– হ্যাঁ
– বলো
– তাওহীদ এর ব্যাপারে কি ভাবলা
– টেনশন করো না , দেখি ব্যবস্থা একটা হবেই
– হুম
– আচ্ছা টেবিলে নাস্তা করো , আমি বের হবো
– আচ্ছা রেডি হয়ে নিচে আসো

বেলা ১২ টা বেজে ৪৫ মিনিটে মাহবুব সাহেব সুইজারল্যান্ডের ক্লাইন্টদের সাথে মিটিং শেষ করে অফিসে পৌঁছেছেন । কথা অনুযায়ী আফরোজ কেও আজ অফিসে আসতে বলা হয়েছে । এই দিক টা সব জাহিদই সামলে নিয়েছে । মাহবুব সাহেব চেম্বারে ঢুকেই জাহিদ কে কল দেয় আফরোজ কে নিয়ে কেবিনে আসার জন্য ।

– may i come in sir
– yes come
– আসসালামু আলাইকুম স্যার
– ওয়ালাইকুম আসসালাম আফরোজ , জাহিদ আফরোজ দুজনেই বসো
– স্যার কোন সমস্যা হয়েছে কি ?
– আফরোজ তোমার সাথে আমি কিছু কথা শেয়ার করতে চাই , ভেবে নাও আজকে তোমার বস না তোমার সামনে তোমার বাবা বসে আছে
– স্যার আপনি শুধু আদেশ করুন , আর কিছুই লাগবে না
– আফরোজ , তাওহীদের ব্যাপার টা তো কিছুটা হলেও জানো । আমার এই বিশাল সম্পত্তিরএকমাত্র উত্তরাধিকারী সে , কিন্তু নিজেকে প্রায় শেষ করে দিচ্ছে সে । আমি বাবা হয়ে এইসব কিভাবে মেনে নিবো বলতে পারো মা ?
– স্যার ক্লিয়ার করে বললে ভালো হয়
– আফরোজ , আমি তাওহীদের একটা বিয়ে দিতে চাই , তোমার জানা শুনার মধ্যে কি কোন ভালো মেয়ে আছে ? দেখো , আমি আমার অফিসের সব স্টাফদের থেকে তোমাকে আর জাহিদ কে সব থেকে বেশি বিশ্বাস করি । এই ব্যাপার টা একটু তুমি দেখবা প্লিজ
– কিন্তু স্যার , বিয়ের কথা তো বললেন , এইটা ভেবে দেখেছেন কি তাওহীদ স্যারকে কে বিয়ে করবে ? স্যার কিছু কথা খারাপ লাগলেও সত্যি , তেমনি এইটাও সত্যি যে তাওহীদ স্যার একজন বদমেজাজি নেশাগ্রস্থ একজন যাযাবর জীবন যাপন করার মানুষ । তিনি কি সংসার ধর্ম বুঝবেন ? নাকি যাকে বউ করে আনবেন তার দ্বায়িত্ব নেবে ?
– তোমার সব কথাই যুক্তিসংগত , কিন্তু আফরোজ এর বিপরীত টাও তো হতে পারে । হয়ত ও বদলে গেলো , বাবা হিসেবে এতটুকু তো ভাবতেই পারি আমি , তাই না ?
– স্যার আমি খোঁজ খবর নিবো , আর আপনি ও আপনার মত চেষ্টা করুন
– আমি বললে আমার সব বন্ধুরা তাদের মেয়ে নিয়ে হাজির হবে আমার বাসায় , কিন্তু আমি এমন কাউকে চাই যে একমাত্র পারবে আমার ছেলেকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে আসতে
– ঠিক আছে স্যার , দ্বায়িত্ব যখন চেষ্টা করবো পালন করার , তাহলে স্যার উঠি আজকে
– আচ্ছা এসো
– আসসালামু আলাইকুম
– ওয়ালাইকুম আসসালাম
– স্যার তাহলে আমিও উঠি
– আচ্ছা , জাহিদ সুইজারল্যান্ডের ক্লাইন্টদের সাথে মিটিং টা ভালো হয়েছে , পরশু ওরা প্রজেক্ট সাইন করবে , সব রেডি করো
– জ্বি স্যার

চেম্বার থেকে বেড়িয়ে জাহিদ আফরোজ কে ডাক দিয়ে বসলো

– আফরোজ
– জ্বি , কিছু বলবেন ?
– হ্যাঁ
– বলুন
– আফরোজ , ওই যে সেইদিন একটা মেয়ে এসেছিল না তোমার কাছে
– কে , কবে , কোন দিন বলুন তো
– আরে ওইদিন যে আমি ফ্যাক্টরিতে গেলাম আর সেই মেয়েটাও আসলো , তোমার পাশের আসায় থাকে
– ওহ হো , আপনি কি পাগল
– কেন
– আমি ওর মত এত শান্ত মেয়েকে এর মত নেশাখোরের সাথে মিলিয়ে দিবো
– তাওহীদ স্যার কিন্তু এত টাও খারাপ না
– জানি জানি , কত টা ভালো আমার জানা আছে , আচ্ছা আসি
– ভেবে দেখতে পারো

সন্ধ্যা ৭ টা বেজে ২৫ মিনিট । বারে বসা তাওহীদের সব ফ্রেন্ডস রা তার জন্য অপেক্ষা করছে । মূলত তাওহীদকে খারাপ করার পেছনে এদের অনেক বড় অবদান আছে । এরা সব রকম চেষ্টায় থাকে তাওহীদের টাকা এবং তাওহীদের সম্মানের ১২ টা বাজানোর । এমন সময় তাওহীদের গাড়ি এসে বারের সামনে দাঁড়ায় । গাড়ি থামার আগে তাওহীদ সাহেব একটা কান্ড ও ঘটিয়ে ফেলেছে অবশ্য , সেই সময় সেই রাস্তা দিয়ে একজন হেটে যাচ্ছিলো । বেচারি রোড ক্রস করবে আর এমন সময় তাওহীদের গাড়ি ধাক্কা দেয় তাকে ।
গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায় সে । ৬ ফুট উচ্চতার সুঠাম গঠন লাল সুন্দর গরনের একজন সুদর্শন ছেলে তাওহীদ । যাকে দেখলেই এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে সব মেয়েদের মাঝে । কিন্তু চোখ মুখে নেশার ঘোর টা সর্বক্ষণ লেগেই থাকে ।
আর ওইদিকে মেয়েটার হাত থেকে পলিথিন টা পড়ে মাটিতে ফল গুলো ছড়িয়ে যায় । তাওহীদ guilty ফিল করছে খুব । তাই যেচে গিয়ে সরি টাও বলতে যায় ।

– excuse me miss , i am sorry
– একটু দেখে শুনেও তো চালাতে পারেন , তাই না ?
– ok sorry
– ফল গুলো আমার বাবার জন্য ছিল
– ok , no probolem কত টাকা ? আমি দিয়ে দিচ্ছি
– ধন্যবাদ , আমি ভিক্ষা নেই না
– আজব তো ভিক্ষা কেন হবে , আমার হাত থেকে নষ্ট হয়েছে ক্ষতিপূরণ টা আমিই দিব
– লাগবে না , ভালো থাকবেন

মেয়েটা ফল গুলো কুড়িয়ে নিয়ে সেইখান থেকে চলে গেলো । তাওহীদ যেমন বিনয়ী তেমন বদমেজাজিও বটে । সেই মুহুর্তে তার চরম রাগ উঠে গিয়েছে । মেয়েটার সাহস দেখে অবাক সে , আজ পর্যন্ত কোন ছেলে তার সাথে উচ্চ গলায় কথা বলে নি আর মেয়েরা তো দূরেই থাক কিন্তু আজকে কোথাকার কোন মেয়ে সে শান্ত গলায় তাকে জ্ঞান দিয়ে যায় , ঘটনা টা বেশ খারাপ লাগে তার কাছে

– কিরে আজ লেট করে আসলি
– হ্যাঁ একটু লেট হয়ে গেল
– তা বল কি অর্ডার করবি আজ
– কোকিন এনেছিস ?
– তাওহীদ , তুই বলছিস আর আমি আনবো না , তা হয়েছে কখনো , এই নে
– দে , এক কাজ কর , আজ brandy আর whisky অর্ডার কর
– ওকে

দামী দামী ড্রিঙ্ক তো অর্ডার করে দিল তাওহীদ । আর বন্ধুরাও সমানে ড্রিঙ্ক এর স্বাধ নিচ্ছে দারুন ভাবে । কিন্তু তাওহীদ অন্য ধ্যানে মগ্ন । বার বার সেই মেয়েটার কথা মনে পড়ছে তার । তাওহীদ যেমন বিনয়ী তেমন বদমেজাজিও বটে । প্রচন্ড পরিমাণ রেগে আছে সে এই মুহূর্তে । আজ পর্যন্ত কোন ছেলে তার সাথে উচ্চ স্বরে কথা বলার সাহস পায় নাই আর কোথাকার কোন মেয়ে রাস্তায় শান্ত গলায় তাকে জ্ঞান দিয়ে গেছে , ব্যাপার টা তার কাছে হজম হয় নি । এই প্যাগ ড্রিঙ্ক ও তার গলা দিয়ে নামছে না আজ । এইদিকে বন্ধুরাও জোড় করছে তাকে খাওয়ানোর জন্য ।
বসে থেকেই সাকিল কে কল দেয় তাওহীদ ,

– হ্যালো সাকিল
– হ্যাঁ বল
– কোথায় তুই
– এই তো অফিস থেকে বের হবো , কেন ?
– একটু দেখা কর‍তে পারবি ?
– কেন ? আজকেও কি মন টা অশান্ত হয়ে আছে নাকি ?
– তুই আমার অশান্ত মন কে শান্ত করার এক প্রকার টনিক , তুই জানিস না ?
– আচ্ছা আয় ,
– কোথায় থাকবি
– পুরনো জায়গায় চলে আয়
– ওকে , তুই অফিসেত সামনে থাক আমিই তোকে পিক করতে আসতেছি
– নাহ থাক লাগবে না , আমার সাথে গাড়ি আছে
– ওকে

সাকিল হচ্ছে তাওহীদের আরেক ফ্রেন্ড । অন্য ফ্রেন্ড রা যেমন তাওহীদকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে মত্ত থাকে আর এই বন্ধু তখন তাকে আলোয় ফেরাতে মত্ত থাকে । যা তাওহীদ ও ভালো মত বুঝে তাই তো মাঝে মাঝেই সে সাকিলের সাথে সময় কাটায় । মাঝে মাঝে বললে ভুল হবে যখন তাওহীদ অশান্ত থাকে তখনই সে সাকিল এর কাছে ছুটে যায় ।
– দোস্ত কেমন আছিস
– ভালো , তুই
– ভালো আছি
– আয় বস
– হ্যাঁ , চল বসি
– এখন বল কেন ডেকেছিস
– আজ বারের সামনে একজন কে দেখলাম
– কাকে দেখেছিস তুই আবার
– একটা মেয়েকে…………
তারপর পুরো ঘটনা খুলে বললো সাকিল কে । আর সাকিল ও মন দিয়ে সব টা শুনলো । সাকিল লক্ষ্য করল তাওহীদ প্রচুর রেগে আছে , মনে হচ্ছে মেয়েটাকে সামনে পেলে এখনি জ্যান্ত কবর দিবে সে ।
– তো কি করতে চাচ্ছিস এখন
– ওকে আমার চাই সাকিল
– What
– yes , i want her at any cost
– are you mad তাওহীদ , যাকে চিনিসই না তার উপরে এত ক্ষোভ কেন
– নাহ , ওকে আমার চাই , এক ঘন্টার জন্যে হলেও ওকে আমার চাই সাকিল , আমায় জ্ঞান দেয় , আমি টাকা দিতে চাইলাম আর বলে সে ভিক্ষা নেয় না , ধুর এইসব ধান্দাবাজ মেয়েদের ভালো করে চেনা আছে আমার
– আন্দাজে ধান্দাবাজ বলিস কেন ?
– আন্দাজে না , যা সত্যি তাই এই মেয়েকে আমার চাই
– তুই নেশাখোর এইটা জানতাম , কিন্তু তুই যে মেয়েদের নেশাতেও মত্ত থাকিস তা তো জানতাম না ?
– তাহলে বলবো তুই তাওহীদের টেস্ট সম্পর্কে কিছুই জানিস না । তাওহীদ ড্রিঙ্ক আর মেয়ে দুটাই ক্লাস দেখে টেস্ট করে
– একটা কথা বলি ?
– বল
– শুন , প্রথমত দোষ টা তোর কেন বলি , তোর গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়েছে । তোর কথা অনুযায়ী ফল গুলো তার বাবার জন্য ছিল । গিয়ে দেখ হয়তো মেয়েটার বাবা অনেক অসুস্থ কিংবা হয়তো ফল গুলো কেনার টাকা টা সে অনেক কষ্ট করে যোগাড় করেছে তাই খারাপ লেগেছে তার আর তুইও বোকার মত ধুম করেই টাকা দিতে চাইলি । সব কিছুই যদি টাকা দিয়ে পরিমাপ করিস তাহলে কিভাবে হবে ?
– তাই বলে তাওহীদ মাহবুবের টাকা কে সে ভিক্ষা বলবে
– আচ্ছ হয়তো খারাপ লাগা থেকে বলেছে , বাদ দে
– বাদ তো কিছুতেই দিব না আমি এর শেষ দেখে তারপর ছাড়ব
– তোকে বুঝানো আর ৫০০ কিলোমিটার দৌড়ানো এক কথা । অনেক সময় যেমন দৌড়িয়ে কোন কাজ হয় না ঠিক তেমনি তোকে বুঝিয়েও লাভ হয় না , বুঝতেই চাস না তুই
– বাদ দে , তোর সাথে দেখা করলে আমার মন টা ভালো হয়ে যায় তাই দেখা করতে আসি
– ভালোই করিস , আচ্ছা আংকেলের অফিসেও তো বসতে পারিস তাই না
– বসি মাঝে মাঝে কিন্তু ভালো লাগে না ধুর এইসব আমার জন্য না
– তাহলে কি তোর জন্য লেট নাইট পার্টি , ড্রিঙ্ক করা , এইসব ?
– সাকিল বাদ দে প্লিজ , আজ আসি রে
– কোথায় যাবি সে বারে তাই তো ?
– নাহ আজকে বাসায় চলে যাবো
– আচ্ছা তাহলে বাসাতেই চলে যা আজকে
– হুম

বাসায় এসে মোবাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করছে তাওহীদ । তাকে বাসায় দেখে রাবেয়া বেগম আর মাইশা দুজনেই অবাক আজ এত তারাতারি আর তাও বিনা নেশায় । একটু ভিমরি খেয়ে উঠে দুজনেই । ছেলের এই ভালো দিক টা আজ অনেকদিন পড়ে নজরে পড়ল রাবেয়া বেগমের ।

– তাওহীদ
– হু
– কিরে আজ এত তারাতারি বাসায় চলে এলি
– কেন কোন সমস্যা ?
– নাহ সমস্যা হবে কেন
– তাহলে প্রশ্ন কেন করো , অযথা প্রশ্ন করবা না আমাকে , আমি উপরে যাচ্ছি একদম ডাকা-ডাকি করবা না

এই বলে তাওহীদ সোজা উপরে উঠে যায় । রাবেয়া বেগম বেশ বুঝতে পেরেছেন যে আজ তার ছেলের মেজাজ খুব খারাপ তাই আর কথা বাড়ান নি তিনি । শুধু দিন রাত আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া করে যাচ্ছেন তার ছেলে টা যাতে আগের মত হয়ে যাক । কেউ একজন তার জীবনে আসুক । তার ছেলের জীবন টা পালটে যাক ।
– হ্যালো আফরোজ আপু
– হ্যাঁ বল
– তোমার সাথে কিছু জরুরী কথা আছে
– হ্যাঁ বল না
– আপু একটু তোমার বাসায় আসি ? তুমি কি বাসায় আছো ?
– হ্যাঁ আধা ঘন্টা হবে আসলাম , আয় তুই
– আচ্ছা আপু
– আচ্ছা তনু কিছু হয়েছে কি ?
– এসে বলি ?
– আচ্ছা আয়
– আচ্ছা

১৫ মিনিট পর বেল এর আওয়াজ পেয়ে আফরোজ দরজা খুলে দেয় । দেখে তনু বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে । চোখে মুখে বিষন্নতার ছাপ ।
তনু , ভালো নাম মাহজাবিন তনুশা । সবাই তনু বলেই ডাকে । মোটামুটি লম্বা না হলে উচ্চতায় ঠিকঠাক । বেশ ফর্সা বর্ণের মেয়ে সে , চোখ দুটো তে যেন অন্য রকম শান্তি লুকিয়ে আছে । তনুর মুখের দিকে এক দন্ড তাকালেই কলিজা ঠান্ডা । মাস্টার্সে পড়াশোনা করছে সে । বাবা মা দুই ভাই আর বোন কে নিয়ে তার সংসার । বাবা গত এক বছর হলো স্ট্রক করে প্যারালাইসিস হয়ে পড়ে আছেন ঘরে । সংসার এর পুরো দ্বায়িত্ব তনু আর তনুর এক ভাইয়ের উপরে । সকাল ৮ টা থেকে রাত ১০ টা অবদি টিউশনি রাখে মেয়েটা মাঝে গোসল খাওয়ার জন্য দুই ঘন্টা । এভাবেই ভাই বোন মিলে সংসার টা সামলায় ।

– কেমন আছিস তনু
– কেমন আর থাকি জানোই তো ?
– কি হয়েছে
– আপু রে ভালো একটা চাকরি যোগাড় করে দিবা প্লিজ
এইভাবে আর হচ্ছে না আপু , হাপিয়ে উঠছি অনেক । টিউশনি তে আর পোষাচ্ছে না আপু । এর মধ্যে কয়েকজন তো সেলারিও আটকে রেখেছে । চলি কিভাবে আপু , আব্বার ওষুধের খরচ ছুটকি আর রুবেলের পড়ার খরচ বাসা ভাড়া সব মিলিয়ে আপিরে উঠতেছি , আপু তুমি যেখানে কাজ করো আমাকে সেখানে একটা চাকরি যোগাড় করে দিবা ? অন্তত মাস শেষে সেলারির জন্য অপেক্ষা তো করতে হবে না । এই জন্যেই আসা তোমার কাছে

আফরোজ অনেকক্ষণ তনুর দিকে তাকিয়ে আছে । মেয়েটার মলিন মুখ টা দেখে ভেতর টা কেপে ওঠে আফরোজের । একটা কত টা কষ্টে থাকলে এমন সংগ্রামী হতে পারে । জীবন যুদ্ধে নিজেকে ঠিক খাপ খাওয়াচ্ছে । চট করেই আফরোজের মাথায় একটা কথা চলে এলো ।

– তনু
– হুম বলো
– বিয়ে করবি ?
– কিহহহহহহহহহহহ

Leave a Comment

Please wait...

Subscribe to Our Newsletter

Want to be notified when our article is published? Enter your email address and name below to be the first to know.